গলদা চিংড়ির “শ্যাওলা রোগ” বা জোথামনিয়াম: একটি নীরব শত্রু ও তার সমাধানের গল্প

কল্পনা করুন, আপনার ঘেরের একটি সুস্থ-সবল গলদা চিংড়ি (macrobrachium rosenbergii / Freshwater prawn) হঠাৎ অলস হয়ে পড়েছে। তার শরীরে, পায়ে আর শুঁড়ে যেন কেউ সবুজ বা বাদামি রঙের একটা জরাজীর্ণ চাদর জড়িয়ে দিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে গায়ে শ্যাওলা জমেছে বা লোম গজিয়েছে। আসলে এটি কোনো সাধারণ শ্যাওলা নয়, এটি হলো জোথামনিয়াম (Zoothamnium) নামক এক ধরনের পরজীবী প্রোটোজোয়া।

১. সমস্যার শুরু যেখানে (কারণ ও লক্ষণ)

এই সমস্যাটি সাধারণত একা আসে না। যখন ঘেরের তলদেশে অতিরিক্ত জৈব কাদা জমে যায়, পানি স্থির হয়ে থাকে এবং অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়, তখনই এই পরজীবীরা চিংড়ির গায়ে বাসা বাঁধে।

চিংড়ি গুলো তখন এমন হয়:

  • শরীরে সবুজ/বাদামি লোমের মতো আস্তরণ পড়ে যায়।
  • চিংড়ি খাবার খেতে চায় না এবং চলাফেরা কমিয়ে দেয়।
  • সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, চিংড়ি তার খোলস বদলাতে (Molting) পারে না।
  • শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত চিংড়ি মারাও যেতে পারে।

২. কেন এমন হলো? (পেছনের কারণ)

ঘেরের পরিবেশ যখন ভারসাম্য হারায়, তখনই এই রোগ হানা দেয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

  • অপরিচ্ছন্ন তলদেশ: ঘেরের নিচে অতিরিক্ত বর্জ্য ও কাদা জমা হওয়া।
  • অক্সিজেনের অভাব: পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়া।
  • স্থবির পানি: পানিতে পর্যাপ্ত স্রোত বা নাড়াচাড়া না থাকা।
  • বিষাক্ত গ্যাস: অ্যামোনিয়া ও নাইট্রাইট বেড়ে গিয়ে চিংড়িকে দুর্বল (Stress) করে ফেলা।

৩. সমাধানের পথ: যেভাবে মুক্তি পাবেন

জোথামনিয়াম তাড়াতে ওষুধের চেয়ে ঘেরের পরিবেশ ঠিক করাই আসল কাজ। চলুন ধাপে ধাপে জেনে নিই:

ধাপ ১: ঘর পরিষ্কার (তলদেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা)
সবার আগে ঘেরের তলদেশের কাদা সরানোর চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে ২০–৩০% পানি ধীরে ধীরে পরিবর্তন করুন। অ্যারেটর থাকলে তা চালিয়ে দিন যাতে অক্সিজেনের মাত্রা ৫ পিপিএম-এর উপরে থাকে।


ধাপ ২: প্রাকৃতিক চিকিৎসা

  • চুন ও জিওলাইট: একর প্রতি ২০–২৫ কেজি চুন এবং ১৫–২০ কেজি জিওলাইট ব্যবহার করুন। এটি পানির পিএইচ (pH) ঠিক রাখবে ও ক্ষতিকর গ্যাস কমাবে।
  • প্রোবায়োটিক: পানির ও মাটির গুণাগুণ ফেরাতে নিয়মিত ভালো মানের প্রোবায়োটিক ব্যবহার করুন।


ধাপ ৩: পুষ্টিকর খাবার
অতিরিক্ত খাবার দেওয়া বন্ধ করুন, কারণ পচা খাবার থেকেই সমস্যার সৃষ্টি। চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খাবারের সাথে ৫–৭ দিন ভিটামিন-সি এবং মিনারেল মিক্স মিশিয়ে দিন।


ধাপ ৪: বিশেষ সমাধান (প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে)
যদি সংক্রমণ বেশি হয়, তবে একর প্রতি ১ লিটার পল গার্ড ব্যবহার করতে পারেন। সাথে শতাংশ প্রতি ২৫০-৩০০ গ্রাম পাথুরে চুন দিন। তিন দিন পর পর এক ডোজ ভিভাসয়েল প্রয়োগ করলে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।

৪. সাবধানতা: যা করবেন না

  • হুজুগে পড়ে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না, এতে হিতে বিপরীত হয়।
  • একসাথে গাদা গাদা কেমিক্যাল ঢালবেন না।
  • হঠাৎ করে অনেক বেশি পানি বদলে চিংড়িকে আরও চাপে (Stress) ফেলবেন না।


মনে রাখবেন, জোথামনিয়াম কোনো মরণব্যাধি নয়, এটি আসলে ঘেরের পরিবেশ খারাপ হওয়ার একটি সংকেত। ঘেরের তলা পরিষ্কার আর পানি সতেজ রাখলে চিংড়ি নিজে থেকেই খোলস বদলে এই রোগ ঝেড়ে ফেলে দেবে। সকল ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে, সুস্থ পরিবেশই সুস্থ চিংড়ি উৎপাদনের চাবিকাঠি।



কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ তাসলিম মাহমুদ