চিংড়ির পুকুরে জীবাণুনাশক ব্যবহার কি ঠিক নাকি বেঠিক, তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা। তবে, আমাদের চাষী ভাইয়েরা, বুঝন আর না বুঝন, প্রচুর জীবাণুনাশক ব্যবহার করেন এবং ভাইয়েরা এত রকমের জীবাণুনাশক ব্যবহার করেন যে তার রয়েছে বিশাল এক লিস্ট, সব নাম মনে রাখা এক মানুষের পক্ষে সত্যিই কঠিন।
এখন ভাবতে পারেন, পুকুরে জীবাণুর আক্রমণ হলে তো দিতেই হবে, নাকি?
আসলে সহজ অঙ্কের হিসাবে তো দেবার কথাই বলে, কিন্তু গোলটা বাঁধে অন্যখানে…
ধরুন, এক চাষী ভাই জীবাণু মারতে ব্যবহার করলেন BKC, অথবা দিলেন Glutaraldehyde বা Iodine। এই ওষুধগুলো সব রকমের জীবাণু মারে, ভালো আর মন্দ সবাইকে।
দেবার পর চাষী ভাইয়ের শুরুতে মনে হলো, সব ঠিকঠাকই তো হচ্ছে। কিন্তু আসলে সমস্যা তখন থেকেই শুরু হলো। সাদা চোখে না বোঝা গেলেও, পুকুরের পরিবেশে চোখের আড়ালে এক বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ হয়ে গেছে।
আমাদের পুকুরে যে শুধু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে, তা না—অনেক ভালো ব্যাকটেরিয়াও থাকে। আর এই ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোই পুকুরের আসল প্রাণ।
ভাবছেন, ব্যাকটেরিয়া আবার ভাল হয় কী করে? আসলে ভালো-মন্দ তার কর্মের ওপর নির্ভর করে। যার কাজ আমাদের জন্য উপকারী, সেটাই ভালো। আর যার কাজ আমাদের ক্ষতি করে, সেটাই মন্দ।
একটা উদাহরণ দিই। আমরা বিয়েবাড়িতে গেলে খাবারের পর দই খাই। এই দই কিন্তু আমাদের হজম করতে অনেক সাহায্য করে, সে কথা তো সবাই জানি, তাই না?
কীভাবে করে? দইয়ে থাকে একধরনের ভালো ব্যাকটেরিয়া। তারা আমাদের পেটের ভেতর গিয়ে বাসা বাঁধে। আর খাবারগুলো ভেঙে হজম করতে সাহায্য করে।
ঠিক তেমনিভাবে, পুকুরের তলদেশেও ভালো আর মন্দ দুই দলের ব্যাকটেরিয়া আছে। তাদের কর্মের ওপর নির্ভর করে তারা আমাদের উপকারী নাকি অপকারী।
আর এই ভালো ব্যাকটেরিয়াদের মধ্যে দুই বন্ধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নাইট্রোসমোনাস আর নাইট্রোব্যাক্টার।
এখন প্রশ্ন আসে, ওরা আসলে আমাদের বন্ধু হয় কী করে? চলুন দেখে নিই…
- প্রথম বন্ধু, নাইট্রোসমোনাস → অ্যামোনিয়াকে (যার ভয়ংকর বিষের কথা সবাই কমবেশি জানেন) ভেঙে নাইট্রাইট বানায়। নাইট্রাইটের বিষাক্ততা মাঝারি লেভেলের।
- দ্বিতীয় বন্ধু, নাইট্রোব্যাক্টার → সেই নাইট্রাইট (মাঝারি বিষ) কে ভেঙে নাইট্রেট বানায়। নাইট্রেট প্রায় নিরীহ, এক রকম ক্ষতিহীন বলা যায়।
আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নামই নাইট্রিফিকেশন। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এটাই আমাদের পুকুরের বিষ কমানোর সৃষ্টিকর্তা দেওয়া প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণ ব্যবস্থা। আমরা পুকুরে/ঘেরে যে সয়েল বা ওয়াটার প্রোবায়োটিক দিই, তার কাজ আসলে নাইট্রিফিকেশন করার হার বাড়ানো মানে প্রোবায়োটিক ব্যাক্টেরিয়ার পরিমান বৃদ্ধি করা।
কিন্তু চাষী ভাইয়েরা যখন জীবাণুনাশক দেন, তখন কী হয়?
ভালো-খারাপ সব ব্যাকটেরিয়াই মারা যায়। ফলে নাইট্রিফিকেশন বন্ধ হয়ে যায়। পুকুরে অ্যামোনিয়া জমতে শুরু করে, নাইট্রাইট বাড়তে থাকে, আর পানি ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
আমাদের পুকুরের তলদেশে প্রতিদিনই কিছু জিনিস জমে:
- উচ্ছিষ্ট খাবার
- মাছ বা চিংড়ির মল
- মৃত ফাইটোপ্ল্যাংটন
সাধারণত প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াগুলো ওগুলো ভেঙে পুকুরের জন্য ক্ষতিকর হতে দেয় না। কিন্তু জীবাণুনাশকের ফলে যখন ওরা মরে যায়, তখন পুকুরের তলদেশের পরিশুদ্ধি ঠিকমতো হয় না। বরং পুকুরের তলেদেশে তৈরি হয় অক্সিজেনশূন্য (anaerobic) পরিবেশ।
আর এই অবস্থায় পৌঁছালেই তখন তৈরি হয় সেই সব গ্যাস, যেগুলো চাষের পুকুরের জন্য খুব ক্ষতিকর:
- অ্যামোনিয়া (এর গন্ধ প্রসাবের মতো)
- হাইড্রোজেন সালফাইড (এর গন্ধ পচা ডিমের মতো)
- মিথেন (এর কোনো গন্ধ নেই, নীরব ঘাতক)
এই ক্ষতিকর গ্যাস বাড়ার সাথে সাথে পানির অক্সিজেন কমতে থাকে। নাইট্রাইট দ্রুত বেড়ে যায়। তখন চিংড়ি মারাত্মক স্ট্রেসে পড়ে যায়। তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর এই পরিবেশটা কিন্তু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোর জন্য খুব ভালো। তারা দ্রুতই নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে পারে। ফলাফল কী হয়?
- ভিব্রিওসিস (Vibriosis)
- শেল নেক্রোসিস (খোলস পচা)
- ব্ল্যাক গিল (ফুলকা পচা)
মানে, রোগ কমানোর জন্য যে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, সেটাই নতুন রোগের দরজা খুলে দেয়।
এই পুরো ঘটনাচক্র থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মাইক্রোবিয়াল ব্যালান্স বা অণুজীবের (ব্যাক্টেরিয়ার) ভারসাম্যটা নষ্ট হয়ে যাওয়া। জীবাণুনাশক দেওয়ার পর পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ উলট-পালট হয়ে যায়। তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়াগুলো ভালোদের চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়তে পারে। তাই তারা খুব দ্রুত পুকুরের দখল নিয়ে নেয়।
আমাদের চাষী ভাইয়েরা কী করেন? বুঝে হোক আর না বুঝে, যার-তার পরামর্শে সমস্যা বোধ করলেই—
এক, ধামাধাম জীবাণুনাশক দেন।
দুই, তারপর আবার প্রোবায়োটিক দেন।
তিন, পুনরায় সমস্যা হলে ঝটপট আবার জীবাণুনাশক দিয়ে দেন।
মানে, এভাবেই চাষী ভাইয়েরা একটা দুষ্টচক্রের মধ্যে ঢুকে যান। যেখানে সমস্যা কমার বদলে বারবার ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত পুকুর ক্রাশ করলে সময়, অর্থ, সবকিছু হারাতে হয়।
এই কারণেই আমরা সবাইকে জীবাণুনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকটা বুঝিয়ে, প্রোবায়োটিক নির্ভর—মানে পুকুরের নিজস্ব প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিই।
প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে কাজে লাগাতে পারলে, কেন অযথা অর্থ খরচ করে নিজের ক্ষতি ডেকে আনবো আমরা?
মূল লিখার ক্রেডিটঃ তছলিম মাহমুদ, অ্যাকুয়াকালচার কনসাল্টেন্ট
